প্রাচীন বাংলার কবিতা ও গানে সেইসময়ের সমাজ জীবনের নানান দিক ধরা পড়ে। যেখানে সেইসময়ে মেয়েদের জীবনে বিয়েকে ঘিরে যে চিত্র উঠে আাসে তা আজকের মতোই বিষাদময়। পণপ্রথার শিকার সেদিনের কণ্যাদায়গ্রস্থ পিতার। একটা অসম্পূর্ন কবিতায় এই ছবি ধরা পড়ে।
বাড়ীর পিছে ডালম গাছে একটি ডালম ধরে।
একটি ডালম ছিঁড়ি রাজা কণ্যাদান করে।।
কণ্যাদাণ করি রাজা ফোঁপাই ফোঁপাই কাঁদে।
বড় ভাইরে কাঁদন করে দোলার ঝলির খুন্তা ধরি।।
ছোট ভইনে কাঁদন করে খেলার ঘরে বসি।।
আমার দিদি কনে নিল খেলা ভঙ্গ করি।
বড় ভইজে কাঁদন করে পাক ঘরেতে বসি।।
কণ্যাদান প্রথার থেকে রেহাই মেলে না রাজারও। সামান্য ডালিম দিয়েও তাকে কণ্যার বিয়ে দিতে হয়। ঘৃণ্য পণ প্রথা যে প্রাচীনকালেও অব্যাহত ছিল তা ধরা পড়ে এই কবিতায়।
এই প্রসঙ্গে আরেকটি কবিতা গ্রামবাংলার ছেলেমেয়েদের মুখে এই শোনা যেত বর্ষাকালে ওমেঘলা আকাশের অপরাহ্ন বেলায়। যখন হলুদ রঙের ঝিঙে ফুল ফুঠেছে ক্ষেতে।
ঝিঁয়া ফুল ফুট্টে বেল নাই।
জামাই আইসছে তেল নাই।।
জামাই দিছে ভাতের হারা।
হউরী দিছে ঢেঁকীত বাড়া।।
অবধূতে দিচ্ছে কড়াইত তেল।
একৈক ছোঁতে উড়িয়ে গেল।।
এর পাশাপাশি গ্রাম্য কবির কবিতায় খুব সহজ সরল ভাষায় শোভার বিবরণ পাওয়া যায়। কার শোভা কিসে খোলে তা এক অনবদ্য দৃষ্টিভঙ্গিতে চিত্রিত করেছেন এই ভাবে,
শোভার বিবরণ
ঘরের শোভা ছিক্যোয় পাতিল
বেড়ার শোভা আর
তাহাতুন অধিক শোভা
সোয়ামী আছে যার।।
নিশির শোভা শশী যেন
রাধার সোজা চুল।
আকাশের শোভা তারা যেন
গাছের শোভা ফুল।
দারগার শোভা দারগ্যাগিরি ।
পেয়াদার শোভা লালপাগড়ি।।
হালিয়ার শোভা হালেতে।
জালিয়ার শোভা জালেতে।।
নারীর শোভা অলঙ্কারে
যার যে শোভা করে।
শোভার বিবরণে।
ছিক্যোয় – শিকা, পাতিল – মাটীর হাঁড়ি, আর – বেড়া বাঁধিবার বাকাটি, সোয়ামী – স্বামী, হালিয়ার – চাষার, জালিয়ার --- জেলে।
বিবাহিত মেয়েদের বাপের বাড়ীর আর্কষণ থাকে। সেই বাপের বাড়ীর টানে বাপের বাড়ী যাওয়া নিয়ে গ্রাম্য কবি কবিতায় একটা সুন্দর ছবি ফুটে উঠেছে, তাতে আগমনীর সুর ফুটে উঠেছে। এই আগমনীর সুরে বাপের বাড়ি থেকে ফেরার পর তার স্বামী শিবকে উত্তর দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রচ্ছন্ন কৌতুক যেন সব নারী হৃদয়ের কথা।
পূণ্যধাম বাপের বাড়ী
যাইতে চাহে সকল নারী।
ঐ দেখ না দুর্গাদেবী সিংহবাহিনী।
গণেশেরে কোলত করি আস্তন
সন্মুখেতে নন্দী আইয়ের আশাসোটা ধরি।
ভৃঙ্গী চলে পিছে ধুতুম্ তুতুম্ করি
মেনা আইলা বারাই নিতে আদরের ঝি।
ঝি নাতি দেখি মেনা হাসে ভাসে সুখে।
বাটা ভরি আইন্যে পান দিতে ঝিয়ের মুখে।।
আক বাড়াইয়া নিল মায়ে বাড়ীর ভিতর।
পূজা দিল বলি দিল খাবাইল বিস্তর।।
তিন দির দিন রাখিল মায়ে বড় যতন করি।
চার দিনর দিন বিদয় দিল যাইতে নিজের বাড়ী।।
শিবে বলে কি আনিলা আমার কারণ।
আলুনি কচু শাক
টুনী পোড়া পানিভাত
গরীব বাপের বাড়ী আমার ভোজন।।
কোলত-কোলেতে, আস্তন – আসিতেছেন, আইয়ের – আসিতেছে, ধতুম্ তুতুম্ – ধুপধাপ, বারাই – অগ্রসর হইয়া, আইন্যে – আনিয়াছে, বাড়াইয়া – অগ্রসর হইয়া, টুনী – টুনী পাখি, পানিভাত – পান্তাভাত।
এবার বরের পরিচয় পাওয়া যায় গানে। সেখানে শিব তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে বসে কি করছেন তার বর্ণণা পাওয়া যায়।
বটতলাতে ঠাকুর বৈসে যজ্ঞের আউন জ্বালি।
হাতে লইয়া শি ডমরু কান্ধে ভাঙ্গের ঝুলি।।
পঞ্চ মুখে করে গান, জটে জঠে করে বান
শিঙ্গা বাজে ডম্ ডম্ ডমরু বাজে ডম্ ডম্
ভূতে নাচে ধেইয়া।
নন্দী দাদা নাচন করে তা ধেইয়া তা ধেইয়া।।
ধলা বলদে নাচি নাচি খায় বেলের পাতা।
মেনা বলে এই এলা আমার সুলক্ষণ জামাতা।।
জটার মাঝে বৌ রাখে কোন্তেকার সোয়ামী।
কি করিতে না পারি আমি কি করি না।।
শিবে বলে চুপ কর রান্ধ গিয়া ভাত।
খাইতে আসিবেন এখন ঠাকুর জগন্নাথ।।
আউন – আগুন, শি – শিঙ্গা, ধলা – সাদা,
মেনা – মেনকা, এলা – আসিল, কোন্তেকার -কোথাকার, সোয়ামী – স্বামী, রান্ধ – রন্ধন কর।
- সিদ্ধার্থ বসু
তথ্য সূত্র --- সাহিত্য ১৩২৭
সুইনহো স্ট্রীট ১৪২৭ শারদীয়া
Comments
Post a Comment