Skip to main content

হাঁটতে হাঁটতে

       সব ঠিকঠাক থাকলে এবার নতুন কাজ। কাজের কথা মনে হতেই কেমন যেন সব গোলমাল হয়ে যায় খোকনের। কাজ তো ছিল একটা তা সে ছোট হোক বা বড় হোক। তা দিয়ে সংসারটা গড়িয়ে গড়িয়ে চলছিল। খুব একটা আহামরি না হোক। কিম্তু এখন তাও যে চলতে চায় না। চলবেই বা কি করে বলো, বাজারের যা অবস্থা। 

     একা থাকলেই সারাক্ষণ এই সব ভাবনা তাড়া করে বেড়ায় তাকে। আজকাল কিছুই যেন ভালো লাগে না। সব কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ছেলেটা ভিন রাজ্যে পড়ে আছে। কোনো কিছু করতেই যেন ইচ্ছে করে না তার কারণ  কাউকে কাজের কথা বললেই শুনবে সে, যা চলছে চারদিকে। এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে সময় কোথা দিয়ে যেন বয়ে যায়। আচমকা মিনতির ডাকে চমক ভাঙে। মিনতি তখনও চিৎকার করে চলেছে, বলি, বাজার যেতে হবে তো। বসে বসে কাল কাটালি চলবে? 

--কাল কাটাচ্ছি না। ভাবছি।  

-- বসে বসে ভাবলে চলবে। বাজার যাও। নিজির তো কাজ কম্মো নাই। ছেলেটা কটা টাকা পাঠায় তাতে চলছে। বলতে বলতে মিনতি ঘরের কাজে মন দেয়। 

    ঘর বলতে এক চিলতে ছ্যাঁচার বেড়ার উপর টিনের ছাউনি। তাও গেল ঝড়ে লন্ড ভন্ড হয়ে গেল। সাহায্যের জন্য পঞ্চায়েতে ঘোরাঘুরি হলো, কিন্তু টাকা মিলল না। একদিন ও মানুষটা হতাশ হয়ে দাওয়ায় বসে বললে, ওসব আমাদের জন্যি নয়, গাঁয়ে একন মাতবর হয়েচে ভুনি মন্ডল। তার সাত গুষ্টির নামে নাকি ও টাকা ঢুকেচে ব্যাঙ্কে। একশো দিনির কাজও নেই।  

      বাজারের থলিটা দিয়ে মিনতি বলে ওঠে, দেক, এতডা বেলায় কি পাও। বসি বসি বেলা করলে দেক একন গিয়ে। ওকানে গে আবার দুঃখের গপ্পো করতে বসো না। 

     থলিটা তুলে নিয়ে বলে ওঠে, এবার ছেলে ফিরলে পূজোর আগে ঘরটা মেরামত করে নেবো।

  কথাটা শুনে মিনতি পিছন ঘুরে একবার তাকায়, কোন কথা বলে না। মনেমনে ভাবে সত্যি সারানোর দরকার চালটা। তারপর ওর একটা বে দিতে হবে। সবার ঘরে ছেলেপুলের বে থা দিয়ে ভরা ভত্তি সমসার। আর আমার ঘর দেক। নিজেই নিজের কপালের দোষ দেয়। আবার ঘরের সাত রাজ্যের কাজে মন দেয় প্রতিদিনের মতো।

    বাজারে ঢোকার মুখেই দেখা হয় সতুর সঙ্গে। বহুকালের বাসিন্দা তারা এ গাঁয়ের। সাতপুরুষের ভিটের সবই গেছে দেনার দায়ে। জমিজমা বেচে দু মেয়ের বিয়ে দিল সে। তারপর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বড় মেয়েকে ফিরিযে দিল শ্বশুরবাড়ি থেকে। কারণ পণের টাকা মেটাতে পারেনি সে। সেই থেকেই বাপের ঘরে। 

 ওকে দেখেই খোকন বলে ওঠে, তোর এত দেরী যে? 

মনটা ভাল নেই। 

কেন, আবার কি হলো? 

শুনেছ তো কি এক রোগ এয়েছে তাতে মানুষ মরে যাচ্ছে। নাক মুখ নাকি ঢাকতি হবে, ছোঁয়াছুঁয়ি বাঁচায়ে চলতে হবে। বিদেশে আগে শুরু হয়েছে এখন আমাদের এখানে শুরু হয়েছে।

 কথাডা শুনচি কদিন ধরে,কানাঘুষো। আমাদের একানে কি হবে! ওসব শহুরে রোগ। 

না হে, ছোট মেয়েকাল ফোন করে বলেছে তোমার জামাইয়ের কাজ চলে গেছে। ঐ রোগের জন্যে সব বন্ধ। লকডাউন চলছে। রেলও বন্ধ হয়ে গেছে।

সেকি,সে তো বাইরে কারখানায় কাজ করে।এখন চালাবে কি করে! 

হ্যাঁ। ওখানে আর থাকা যাবে না। সবাই ফিরতে চেষ্টা করছে।  

আমার ছেলেও তো বাইরে। কুনো ফোন আসেনি তো। বাজার করতে করতে খোকন বলে ওঠে। 

হয়ত ছেলে তোমারে ফোনে পাচ্ছে না।  ওদিকিও হয়ত সব বন্ধ হয়ে গেছে বোধহয় এতদিনে । বলে ওঠে সতু। 

আলতাফের ছেলেও তো খোকার সঙ্গেই কাজ করে। বাজারটা ঘরে দে ওর ঘরে যাই। এতো কোনো কালে শুনি নাই যে রোগের জন্যি সব বন্ধ হয়ে যাবে।কাছের মনুষ দূরে চলে যাবে।

             বাড়ি ফিরতে মিনতি বলে ওঠে, আলতাফের বউ এয়েছিল। 

      কি, কি বললে সে?  উৎকন্ঠায় স্থির থাকতে পারে না খোকন।

      ওর ছেলের কাজ চলে গেছে।

       খোকার? খোকনের স্বর প্রায় আর্তনাদের মত শোনায়।

    সবার কাজ চলে গেছে।  কি যেন রোগ এয়েছে দেশে। তারজন্যি..... 

ওরা ফিরতে চেষ্টা করছে কিন্তু সব নাকি বন্ধ ওদিকি। কি হবে একন। 

আমাদের ফোনে হয়ত পাচ্ছে না খোকা  বোধহয়।  খোকার কথা কিছু বললে?  

 না। গলা দিয়ে স্বর বের হয় না মিনতির। বাজার পড়ে থাকে। ছেলেটা কি করছে একন কে জানে। কোথায় আছে্।  

 ভেবে কোন কূল কিনারা পায় না খোকোন। কি করবে এখন!  কি করে খবর পাবে ছেলেটার। ভাবতে ভাবতে বেড়িয়ে পড়ে খোকন। মিনতি চিৎকার করে ওঠে এত বেলায় আবার কোতায় চল্লে? 

  পঞ্চায়েত অফিসে যাই যদি কোনো খবর পাই। খোকন বলে উঠে। 

রোদের তাত বাড়ছে। হাঁটা পথ, কিন্তু ওখানে কি খবর পাবো! দেখা যাক। নিজের মনেই বলে ওঠে। যতে যেতে পথ যেন আর শেষ হয় না। একসময় দূর থেকে দেখে পঞ্চায়েত অফিস, সামনের মাঠে লোকের ভিড়। আজ আবার কি হয়েছে, এত মানুষ কেন!  হঠাৎ পিছনের ডাকে চমকে ওঠে । 

কোনো খবর পেলে?  

পিছন ফিরে দেখে আলতাফ। না সেজন্যেই তো এখানে এলাম।যদি খবর.... 

না, কোনো খবর নাই একানে। আলতাফ বলে ওঠে। শুধু বলছে পরিযায়ী শ্রমিক ট্রেন না পেয়ে নাকি রেল লাইন ধরে হাঁটছে।  

 পরিযায়ী শ্রমিক মানে! ওরা রেলের লাইন ধরে হাঁটছে! অবাক হয়ে প্রশ্ন করে খোকন। ওভাবে কি করে বাড়ি পৌঁছবে। সরকার কিছু ব্যবস্থা করবে না।

জানি না। কে যে কি করবে । আলতাফ বলে উঠে।

তাহলে খবর পাবে কি করে?  মাথায় কিছু ঢোকে না খোকনের। আলতাফের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,কি করবা এখন।  

কি আর করব। চল, ফেরা যাক। দুটো অসহায় মানুষ আজ এক সঙ্গে খুঁজতে থাকে তাদের অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া ছেলেকে। যাদের এখন পরিযায়ী বলছে সবাই।

দিন যায় সংসার অচল হয়। কিন্তু ছেলের খোঁজ মেলে না।রোজকার মতোই আজও অন্য অনেকের মতোই হাজির পঞ্চায়েতে খোকন। হঠাৎ কে যেন চেঁচিয়ে ওঠে, লাইনে কাটা পড়েছে শ্রমিকরা। 

খোকন চিৎকার করে ওঠে কারা কারা কাটা পড়েছে।

ভীড় থেকে কে যেন তখনও বলে চলেছে, লাইনে শুয়ে পড়েছিল ওরা,আর হাঁটতে পারছিল না। ঘুম, গভীর ঘুমে ঢলে পড়েছিল সবাই। 

কিন্তু টেরেন তো বন্ধ ছিল। বলে ওঠে আলতাফ। 

  জানি না। খোকন বলে ওঠে। 

উদভ্রান্তের মতো সত্য এসে হাজির। ওকে ওভাবে দেখে খোকন বলে ওঠে, কি কি হলো?  

যে জায়গাটার কথা বলছে টিভিতে সেখানেই তো জামাই ছিল। মেয়ে কালও ফোনে বলল ওরা লাইন ধরে  হাঁটছে।  তারপর..  

কি? আলতাফ বলে ওঠে।  

রাত থেকে মেয়ের ফোন বন্ধ। জামাইয়ের ফোনও বন্ধ। কোনো সাড়া নেই।বলেই কান্নায় ভেঙে পড়ে সত্য।

-সিদ্ধার্থ বসু

নতুনপথ এইসময়  শারদীয়া ১৪২৭


Comments

Popular posts from this blog

উজ্জ্বল উদ্ধার — প্রাচীন বাংলার গান ও কবিতা

      প্রাচীন বাংলার কবিতা ও গানে সেইসময়ের সমাজ জীবনের নানান দিক ধরা পড়ে। যেখানে সেইসময়ে মেয়েদের জীবনে বিয়েকে ঘিরে যে চিত্র উঠে আাসে তা আজকের মতোই বিষাদময়। পণপ্রথার শিকার সেদিনের কণ্যাদায়গ্রস্থ পিতার। একটা অসম্পূর্ন কবিতায় এই ছবি ধরা পড়ে।          বাড়ীর পিছে ডালম  গাছে একটি ডালম ধরে।                 একটি ডালম ছিঁড়ি রাজা কণ্যাদান করে।।         কণ্যাদাণ করি রাজা ফোঁপাই ফোঁপাই কাঁদে।          বড় ভাইরে কাঁদন করে দোলার ঝলির খুন্তা ধরি।।                ছোট ভইনে কাঁদন করে খেলার ঘরে বসি।।         আমার দিদি কনে নিল খেলা ভঙ্গ করি।        বড় ভইজে কাঁদন করে পাক ঘরেতে বসি।।   কণ্যাদান প্রথার থেকে রেহাই মেলে না রাজারও। সামান্য ডালিম দিয়েও তাকে কণ্যার বিয়ে দিতে হয়। ঘৃণ্য পণ প্রথা যে প্রাচীনকালেও অব্যাহত ছিল তা ধরা পড়ে এই কবিতায়।      এই প্রস...