Skip to main content

বাঙালির সাহেব পুজো

        বাঙালিদের সাহেব প্রীতির বহু গালগল্প ঠাট্টা তামাসা আছে।  হুতোম এর নকশা থেকে নাটক,  প্রহসন ও কবিগানে ছড়িয়ে আছে এই সাহেব প্রীতির নানান ছবি। এই সাহেব প্রীতির কারণে একদল মানষের জীবন পাল্টে গিয়েছিল। জুটেছিল খেতাব ও নানান পুরস্কার। পাশাপাশি চলেছিল ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের ঢেউ। চারিদিকে যখন চলছিল ইংরজ শাসনের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলনের জোয়ার, তখন আর ঞকদল ব্যস্ত ছিল ইংরেজ তোষণে্। 

       সাহেব প্রীতির অন্যতম নজিরের ছবি শ্রীমান পৃথ্বীরাজ কাহিনীতে। রায়বাহাদুর খেতাব পাওয়ার জন্য নির্লজ্জ চাটুকারীতায় অন্যতম বাঙালী মধ্যবিত্ত চরিত্র। এই ইংরেজ তোষণকারী খেতাবধারীরা বিপ্লবীদের ধরিয়ে দিয়ে পুরস্কার লাভ করত। অর্থমূল্যের পাশাপাশি তারা ইংরেজ ঘনিষ্ঠ হয়ে তাদের আয়োজিত বিনোদনের আসর থেকে সভাসমিতিতে ডাক পেত। 

     এই চাটুকারিতার জম্য তারা যে ইংরেজি ভাষা শেখার চেষ্টা চালাত তা নিয়ে মজার ও হাসির খোরাক হয়ে থেকে যেত গানে গল্পে কবিতায়।  এইরকম একটি সঙের গান, 

       হলো ঘোর কলি কারে কি বলি। 

সমাজ দিয়ে ছাড়ে  খারে, সাহেব সাজে বাঙালী।                                                     পমেটম সব দেয় চুলে।

     তেলমাখা সব গেছে ভুলে।।

     উচিত কথা সব বলতে গেলে, 

     বাবু গো, দিবেন আমায় গালগালি। 

সমাজ দিয়ে ছাড়ে – খারে, সাহেব সাজে বাঙালী। এইরকম আর দুটি লাইন, 

           ধাপে ধাপে ভিন্ন ভঙ্গী 

          ব্রাক্ষণ বংশে টেঁশ – ফিরিঙ্গী।। সাহেব ঘণিষ্ট হওয়ার আর একটি চিত্র পাওয়া যায় যেমন,         মাথার উপর ধুচনি চাপা, গায়ে Monkey coat।       চুরুট চেপে ধরে আছে দুটি ভস্মমাখা ঠোঁট। গলায়দড়ি জোটে নাই তাই নেকটাই আছে এঁটে। পেটটি ভরান ‘পেলেটিতে’ পাতের প্রসাদ চেটে।

এঁর আবার মেম ঘরানা ঘরের Miss।।

Mother Home এ কাপড় কাচতেন 

               three pence এ Piece।। 

ভট্টাচার্য্যের বংশধর এখন Mr. Vat।  

বিলিতী বামনি কি ছে বিওবেন ভাবছি আমি that।।  সাহেব তোয়াজ করার বা বন্দনায় অন্যতম নিদর্শন এর ছবি পাওয়া যায় কাঙাল হরিনাথের মহারাণী ভিক্টোরিয়ার বন্দনায় গান রচনায়, 

“ব্রিটিশের নিশান তুলি সবে মিলি, কর জয় মঙ্গলধ্বনি              

বল রে  অনাথ মাতা পতিব্রতা বিক্টোরিয়া মহারাণী,  

ওরে যাঁর রাজ্যের মাঝে উদয় আছে, অস্ত না যায় দিনমণি।“ 

      শিক্ষিত বাঙালি প্রায় অনেকেই মনে মনে আন্তরিকভাবেই ব্রিটিশ শাসনের পক্ষে ছিলেন। বিপিনচন্দ্র পাল এর মন্তব্য এ প্রসঙ্গে স্মরণীয় “এই প্রজন্মের মানুষ তখনো বিস্মৃত হয়নি কোন জায়গা থেকে দেশকে ব্রিটিশ টেনে তুলেছে। মোগল সাম্রাজ্যের শেষ পাদের নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা, প্রতিবেশির বিরুদ্ধে লড়াই, মেয়েদের বিপন্ন সন্মান ইত্যাদি —— কিছুই ভোলার নয়। ব্রিটিশ রাজমুকুট ও ব্রিটিশ শাসনের প্রতি তাদের রাজভক্তি ছিল। কিন্তু সরকারি নীতির সমালোচনা তারা রাজভক্তির সীমানার মধ্যে থেকেই করত।“ 

       ইংরেজদের প্রতি এই ভক্তি মোটামুটি অনেকেই সেময়ে দেখিয়েছেন। এ ব্যাপারে লর্ড রিপন ভারত থেকে ১৮৪৪ সালের ডিসেম্বর বিদয় উপলক্ষ্যে কাঙাল হরিনাথ পোড়াদহ ষ্টেশনে গাড়ি ঢোকার আগে থেকেই উপস্থিত হয়ে ধ্বনি তোলেন সদলবলে ‘ জয় রিপনের জয়'। এ নিয়ে গানও লেখেন, 

        সুশাসনে এ ভারতে প্রজা ছিল নিরাপদে 

           ( তব ন্যায়পরডতায়, সাম্যনীতি) 

         তোমার বিষয়ে কাঁদে নরনারীগণ 

         তিনি তোমায় করুন রক্ষে,জলে স্থলে         অন্তরীক্ষে 

          ( যিনি আত্মার আত্মাতে, এই চরাচরে)                              কাঙাল ফিকিরের এই ভিক্ষে,কাতর নিবেদন।

      লালকালিতে ছাপা সেই গান লর্ড রিপনের হাতে না দিতে পারলেও তা বড়লাটের কাছে পাঠিয়ে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে রিপনকে নিয়ে গ্রামবার্তায় প্রবন্ধও লেখেন। এরকম অনেকেই সে সময়ে ইংরেজ বনন্দায় করেছেন।  কিন্তু ইংরেজ রাজকর্মচারীর মূর্তি গড়িয়ে পুজো করা সবকিছুকে টেক্কা দিয়েঋে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই সত্যি যে বাঙালীরা সাহেবের মূর্তি গড়িয়ে ঘর ঘরে পুজো করেছে।                  ওয়ারেন হেষ্টিংস আমলে যশোরের প্রথম কালেক্টর ছিলেন মিষ্টার টিলম্যান হেংকেল সাহেব। তিনিই প্রথম ঐ পদ অলঙ্কৃত করেন। 

      কালেক্টরের পদের পর তিনি ংকেংকেে  নিমকিমহলের সর্ব প্রধান কর্মচারী পদ লাভ করেন।  নিমকিমহলে দায়িত্ব লাভ করে তিনি নিজেকে অন্য রাজকমচারীর মত  প্রজা পীড়ণকারী হয়ে ওঠেননি। উল্টে যে সব “মলঙ্গী” তাঁহার অধীনে নুন তৈরীর কাজ করত তাদের তিনি নিজের সন্তানের মতই দেখতেন।

 তাঁর প্রজারাও তাকে কি পরিমাণ ভালবাসত তার প্রমাণ হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের মধ্যেই তারা তাদের প্রাণের অনুভূতির প্রকাশ ঘটাতে প্রতিটি মানুষ তাদের ঘরে টিলম্যান হেংকেল সাহেবের মাটির মূর্তি গড়ে পুজো শুরু করেছিল। এটা সংবাদ হিসেবে তখন একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়।

মলঙ্গী বা “ Salt workers were placed under the agents from whom they received advances. They could not selt to any person. The agents stored salt and cold it to whole sale dealers at a price to be fixed by Government every year.”


-সিদ্ধার্থ বসু

Comments

Popular posts from this blog

উজ্জ্বল উদ্ধার — প্রাচীন বাংলার গান ও কবিতা

      প্রাচীন বাংলার কবিতা ও গানে সেইসময়ের সমাজ জীবনের নানান দিক ধরা পড়ে। যেখানে সেইসময়ে মেয়েদের জীবনে বিয়েকে ঘিরে যে চিত্র উঠে আাসে তা আজকের মতোই বিষাদময়। পণপ্রথার শিকার সেদিনের কণ্যাদায়গ্রস্থ পিতার। একটা অসম্পূর্ন কবিতায় এই ছবি ধরা পড়ে।          বাড়ীর পিছে ডালম  গাছে একটি ডালম ধরে।                 একটি ডালম ছিঁড়ি রাজা কণ্যাদান করে।।         কণ্যাদাণ করি রাজা ফোঁপাই ফোঁপাই কাঁদে।          বড় ভাইরে কাঁদন করে দোলার ঝলির খুন্তা ধরি।।                ছোট ভইনে কাঁদন করে খেলার ঘরে বসি।।         আমার দিদি কনে নিল খেলা ভঙ্গ করি।        বড় ভইজে কাঁদন করে পাক ঘরেতে বসি।।   কণ্যাদান প্রথার থেকে রেহাই মেলে না রাজারও। সামান্য ডালিম দিয়েও তাকে কণ্যার বিয়ে দিতে হয়। ঘৃণ্য পণ প্রথা যে প্রাচীনকালেও অব্যাহত ছিল তা ধরা পড়ে এই কবিতায়।      এই প্রস...