ভারতবর্ষের কৃষকরা বারবার তাদের ওপর অন্যায়ের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছে। প্রতিবাদ বিক্ষোভ থেকে বিদ্রোহে সামিল হয়েছে। বারবার তাদের প্রলোভনের শিকার হতে হয়েছে। এই প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে তাদের কি করুণ অবস্থা হয়েছে তার ছবি মেলে বাংলার লোককবির কথায়। লোককবি আবেদ আলী মিয়া কৃষকদের এই লোভের পরিণতির কথা ভেবে বলেছিলেন, “কৃষকরা চাউল ত্যাগ করে লাভের আশায় পাটের ঝুঁকি নিয়েছিল, তাদের এমন একদিন আসবে যখন তাদের সেই পাটগাছের কাঠি খেতে হবে।“ তিনি গান বেঁধেছিলেন,
বুঝলি না তুই বুড়ার বেটা, আবেদের নয়কো ঝুটা
খেতে হবে পাটের গোড়া ঠিক জানিস মোর ভাষা
মনে করেছো নিব টাকা
যে আশা তোর যাবে ফাঁকা
পঁচিশের পয়া হবে তোর, ঋণে পড়বি ঠাসা
নিবি বটে টাকা ঘরে
পেটের দায়ে যাবে ফুরে
হিসেব করে দেখিস খাতা, যতো খরচের পাশা।
নীলচাষ ও পাটচাষ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে অধিক আয়ের যে রঙীন কল্পনার জগৎ গড়ে উঠেছিল সেটা কত বিপদজনক তা লোককবির অন্তর দৃষ্টিতে সহজেই ধরা পড়েছিল।তাই তিনি কৃষকদের সর্তক করেছিলেন। আজও কৃষকদের সুফল হবে এই আশ্বাস দিয়ে কৃষক বিল আানা হয়েছে এবং তা আইনে পরিণত করা হয়েছে। এই সুফলের লোভে কৃষক প্রলুব্ধ না হয়ে পথে নেমেছে। তাতে যারা এই বিলে লাভ হবে কৃষকদের বলে চিৎকার করছে সেইসব মানুষদের স্মরণ করাতে হয় আবদুল সামাদ মিয়ার লোককবিতা। যেখানে কবি বলেন,
পাট আসিয়া যখন দেশেতে পৌঁছিল
পশ্চিমা এসে তখন দখল করিল
এখন তাদের হাতে দেখ পয়সা হইল
বাঙালীরে তারা দেখ কিছু না বুঝিল
না পাইত খাইতে যারা ছাতুয়ার গুঁড়া
বালামের ভাত খায় বুঝে দেখ তারা
না মিলে বাঙালীর রেঙ্গনের ভাত
বোবা হয়ে গেল দেখ বাঙালীর জাত।
যখন সারাভারতে নীল চাষে নীলকরসাহেবদের শোষণে কৃষক সমাজ দিশেহারা তখন ১৮২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর কলকাতার টাউন হলে কলকাতার বাবু আর ইংরেজ রাজকর্মচারীদের সামনে বক্তৃতা রাখলেন রাজা রামমোহন রায় ও প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। এই মহতী সভায় রাজা রামমোহন রায় বললেন, বাঙলা এবং বিহারের বিভিন্ন জেলা ঘুরে আমি দেখেছি যে সব চাষিরা নীলচাষের কাজে যুক্ত, তাদের অবস্থা অন্যদের চাইতে অনেক ভালো। এই নীলকররা এদেশের মানুষদের জন্য অনেক মহানুভবতার পরিচয় রেখেছেন। কি মহানুভবতার পরিচয় রেখেছিলেন নীলকররা তা অবশ্য জানা যায় না। রাজার এই বক্তব্যে উপস্থিত ইংরেজরা সাধুবাদ জানায়।
এরপর বক্তব্য রাখেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। তিনি বলেন, বিভিন্ন জেলায় আমার বেশ কিছু সংখ্যায় জমিদারী আছে। আমি দেখেছি ব্রিটিশদের বসবাস এবং নীলচাষ করার মধ্যে দিয়ে এদেশের মানুষের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। এতে করে জমিদারদের সম্পদ ও প্রতিপত্তি বেড়েছে, আর যেখানে নীলচাষ হয়নি সেখানকার তুলনায় যেখানে নীলচাষ হয়েছে সেখানকার চাষিদের অবস্থার কিছুটা হলেও উন্নতি হয়েছে।
নীল ও পাট চাষ করে কৃষকরা সত্যি সত্যি ফসলের দাম পাবে কিনা এই চিন্তা তাদের ছাড়ছিল না। কৃষকরা কাজের উপযুক্ত দাম কোনদিন কি পেয়েছে্? এ প্রশ্নের পাশাপাশি তাদের জমির অধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠে। খাজনা,বীজ, চাষ, বুনন, গাছকাটা ও দাদনের ট্যাক্স বাবদ খরচ খরচা করে বিঘে প্রতি আট থেকে বারো বান্ডিল নীল হয়। আট বান্ডিল নীলের সব খরচখরচা বাদ দিয়ে হাতে আসে মাত্র এক টাকা। বারো বান্ডিলে পাওয়া যায় মাত্র দু টাকা। চাষ ভালো না হলে দাদনের টাকাও শোধ হয় না। নীলকর সাহেবদের অত্যাচারে অতিষ্ট বাংলার চাষী ঘুরে দাঁড়ায়। ছ - ফুটের শিকল দিয়ে নীলগাছ মাপা হবে। তারপর বান্ডিল হয়ে ওজনদারদের হাতে পড়বে আর সেখানেই মার খেতে হয় রাইয়তীদের। কিন্তু মুখে রা কাটার উপায় নেই। দিনের পর দিন এই অবিচার অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে একদিন গর্জে উঠল বাংলার কৃষক চৌগাছার গ্রামে। ধিক ধিক করে জ্বলা আগুন প্রাণ পেল দিগম্বর বিশ্বাস ও বিষ্ণচরণ বিশ্বাস এর নেতৃত্বে। শুরু হল নীল বিদ্রোহ।
মহাজন ও জমিদারদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে একসময় এদেশের সাঁওতাল কৃষকরা যে বিদ্রোহ ঘোষণা করে সে বিষয়ে জানা যায়,”১৮৫৫ খ্রীষ্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গের সাঁওতাল কৃষক মহাজন ও জমিদারগোষ্টীর বিরুদ্ধে এক লক্ষাধিক সৈন্যের এক বিরাট বাহিনী গঠন করিয়া সমতল ভূমির উপর দিয়া কলিকাতার দিকে অভিযান করিয়াছিল,” উদেশ্য ছিল বড়লাটের কাছে তাদের উপর মহাজনদের অত্যাচারের প্রতিবাদ জানানো। কিন্তু এই কৃষক বিদ্রোহ দমনের জন্য ব্রিটিশ সরকার মিলিটারী নামায়। এই কৃষক বিদ্রোহ প্রথমে মহাজন ও জমিদারদের শোষণ অত্যাচারের বিরুদ্ধে থাকলেও পরে তা সাঁওতাল পরগণার স্বাধীনতা আন্দোলনের লড়াইতে পরিণত হয় সিঁধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরবের নেতৃত্বে। এই সাঁওতাল বিদ্রোহে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের কপালে ভাঁজ পড়ে যায়।তাই ইংরেজ বাহাদৃর যাতে এই বিদ্রোহীদের কড়া হাতে দমন করেন এই অভিপ্রায়ে শ্যামাচরণ সেনের “সমাচার সুধাবর্ষণ” এ লিখেছে, “সন্তালকুলের সর্বনাশ হউক”।
সাঁওতাল বিদ্রোহের আগে ১৮৪৫ সালে মারোয়াড়ী মহাজনদের শোষণ ও অত্যাচারে ভীল কৃষকরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেয় ভাংগ্রিয়া নামে এক ভীল সর্দার। এই বিদ্রোহে তারা কোন মহাজনকে হত্যা করেনি। শুধু তাদের নাক কান কেটে ছেড়ে দেয়। এই বিদ্রোহের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে মারয়াড়ী মহাজনরা🤯 রাজস্থানের গ্রামাঞ্চল ছাড়ে।
ভীল কৃষকদের বিদ্রোহের পর আরেকবার কৃষকরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে ১৮৫২ সালে বোম্বাই প্রদেশের শোলাপুরে। শোলাপুরের গ্রামাঞ্চল মহাজনদের শোষণের মুক্তাঞ্চল ছিল। এই মহাজনদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মারোয়াড়ী মহাজনরা। মারোয়াড়ী মহাজনদের কাছে ঋণের দায়ে বহু কৃষক সর্বশান্ত হয়েছিল। এই মহাজনদের ঋণের ফাঁসে ক্রমাগত জড়িয়ে ভিটে মাটী ঘরবাড়ি খুইয়ে একদিন তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করল। সর্বহারা কৃষকদের ভয়ঙ্কর আক্রমণের মুখে মারোয়াড়ী মহাজনরা পালায়। পরে পুলিশের সাহায্যে তারা আবার গ্রামে ফেরে। পুলিশ বহু কৃষককে গ্রেপ্তার করে।
গুজরাটেও মহাজনদের শোষণ ও অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতে তারা মহাজনদের আক্রমণ করে। তাদের আক্রমণে অনেক মহাজন পঙ্গু হয়ে যায়। তাদের লাঠির আঘাতে প্রাণও হারায় মহাজন। মহাজন বা জমিদারদের অত্যাচার বন্ধ হলেও কিন্তু কৃষকদের উপর শোষণ ও অত্যাচার থামেন নি। শুধু নামের পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। মহাজন গিয়ে ফড়েরাজ কায়েম হয়েছে। ফড়েরাজের পিছনে থাকে রাজনৈতিক মদত্ ফলে ফসলের সঠিক দাম তারা কোনদিনও পায় না। এখন নতুন কৃষিবিলেও যে কৃষকদের জীবনে আশার আলো ফুটবে এমন কথা কি বলা যায়? ফড়েদের হাত থেকে বেঁচে এখন কোট প্যান্ট পরা করপোরেট বাবুদের হাতে পড়ে তাদের জীবন কি আদৌ সুখের হবে এ আশঙ্কা থেকে যায় নাকি? আবার নতুন জালে জড়িয়ে কৃষকরা আত্মঘাতী হবে না তা কে বলতে পারে?
Comments
Post a Comment