Skip to main content

নক্ষত্রের নৈবেদ্য, জলসংক্রান্তির বারো পুকুর

 পুরোনো কলকাতার চেহারা তখনো পাকাপাকিভাবে গড়ে উঠেনি। কিন্তু তখনই কলকাতায় আগমন ঘটতে শুরু করেছে একদল মানুষের যারা সত্যি সত্যিই বন কেটে বসত শুরু করল। এদেরই এক জন  নন্দরাম সেন। দক্ষিন গঙ্গা থেকে শোভাবাজারে এসে উঠেছেন বটে নন্দরাম তবে তার আগেই তিনি শোভাবাজারের জমির পাট্টা নিয়ে রেখেছেন।কলকাতার বসতি তখনো তেমন জমে উঠেনি। 

   বাবু নন্দরাম সেন কলকাতা এসে যে ব্রত চালু করে ছিলেন তা যেমন ছিল চমকপ্রদ তেমনই অভিনব।  সেই ব্রত পালনের সময় সন্ধ্যাকাল। অভিনব সেই ব্রত পালন শুধুমাত্র ঘণ্টা নেড়েই শেষ হত না। তার আয়োজনের ঘটা ছিল খুব। কেমন ছিল সেই আয়োজনের বহর? ঠাকুর চাকর রেখে রোজ রাঁধা হত তার ভোগ পঞ্চাশ ব্যাজ্ঞন।

 রোজ নতুন নতুন থালা বাসনের ব্যবস্হা করা হত এইসব পদ রাখার জন্যে। কিন্তু এত কান্ডের পর প্রশ্ন হচ্ছে এত রকমারি রান্না খাবার খাবে কে। কখনই বা সাজিয়ে দেওয়া হবে এই থালা সাজানো রান্না করা নানা পদ বিগ্রহের  সামনে। কিন্তু সেই বিগ্রহ কোথায়?

  আছে আছে, তবে এ বিগ্রহ সাবেকি ধরনের আর পাঁচটা প্রচলিত বিগ্রহের মত নয়। এই বিগ্রহের দর্শন পেতে অপেক্ষা করতে হবে সূর্য অস্ত যাওয়া অবধি। সন্ধ্যের অন্ধকার না নামলে এর দর্শন পাওয়া যায় না। রাত্রি যত গভীর হবে ততই এই বিগ্রহের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পাবে।

   রাত্রির গাঢ় অন্ধকার ভেদ করে আকাশের বুকে উজ্জ্বল আলোকমালায়  সজ্জিত একদল নক্ষত্রের সমাহার। এই সেই ব্রাহ্ম মূহুর্ত। উন্মুক্ত আকাশের নীচে থরে থরে সাজান নতুন থালায় ভোগ। অন্ধকার আকাশ থেকে নক্ষত্রমন্ডলী নেমে আসবে পৃথিবীর বুকে, গ্রহণ করবে উজ্জ্বল থালায় রাখা এই সুস্বাদু ভোগ। অপেক্ষায় সবাই।

“সন্ধ্যা পরে লক্ষ লক্ষ শিবা উপস্থিত। প্রত্যেকতে আলাহিদা খায় পরিমিত।। 

সর্বরাত্রি বাটি মধ্যে থাকিত শুইয়া। প্রাতেতে মঙ্গলধ্বনি সকলে করিয়া।। অরণ্যে যাইত চলি দিবা আগমনে। পুনঃ সন্ধ্যা কালে পৌঁছে খাইতসেখানে।“  এটাই হচ্ছে সেই “শিবাবলি ব্রত।“ যা আজকের কলকাতার জনজীবন থেকে হারিয়ে গেছে। সেদিন এই ব্রত পালনের জন্য একটি অট্টালিকাও নির্মান করেছিলেন নন্দরাম সেন।

   শুধুমাত্র এই একটি ব্রতই নয়, সেই সময়ের কলকাতায় আরো একটি ব্রতের সঙ্গেও নন্দরাম সেনের নাম জড়িয়ে আছে। বৈশাখের প্রচন্ড দাবাদহে  তখন কলকাতার অবস্থা কাহিল। তাতে যেন সারা পৃথিবী জ্বলছে। ফুটিফাটা মাঠঘাট। এই প্রচন্ড দাবাদহ থেকে মুক্তি পেতে নন্দরামের বৃদ্ধা মা বললেন, জল সংক্রান্তি ব্রত পালন করব। নন্দরাম মায়ে্র ইচ্ছেপূরণে তখুনি ডাক দিলেন পন্ডিতদের। তাঁরা হাজির হয়ে বিধান দিলেন, দ্বাদশ কুম্ভের জল দান করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো কিসের কুম্ভ? সোনা,রুপো,পেতল না মাটীর কুম্ভ। পন্ডিতদের অভিমত কলসীতে জল দানই শ্রেষ্ট দান। কিন্তু এ কথা সেন মহাশয়ের মনঃপুত নয়। তাই তিনি বললেন এর চেয়ে ভাল বিধান কি হয় না? পন্ডিত মশায়রা শশব্যস্ত হয়ে উঠলেন। ব্রাক্ষণ পন্ডিতরা বললেন, 

“স্ব্ণকুম্ভ হৈতে শ্রেষ্ট যদি হে মনন।

পুস্করিণী কিম্বা কূপ করহে খনন।।“

এবার সেন মশাই পড়লেন বিপদে। সময় মাত্র একটা বছর, এর মধ্যে বারোটা পুকুর কাটাই বা হবে কি ভাবে, আর তা একদিনে সেই জল কিভাবে ঢালা হবে। এ এক মহা সমস্যা। আপাতত এই সমস্যার সমাধান করলেন তাঁর গুরুদেব বিশ্বনাথ তর্কবাগীস। যাঁর নিবাস ভাটপাড়ায়। তিনি স্বপ্নাদেশ  দিলেন, এগারোটা পুকুরের জল এক পুকুরে এনে সেই পুকুরটা উৎর্সগ করলেই সবকটা পুকুরই উৎর্সগ করা হবে।  পরে মাকে সেই পুকুর প্রদক্ষিণ করিয়ে আনলেই হবে। অবশেষে এই বিধান মেনেই হলো “জলসংক্রান্তি ব্রত” পালন। 

আজ এই ব্রতের আর কোন অস্তিত নেই এই শহর কলকাতা চলমান ব্যস্ত জীবনে।    

এ প্রসঙ্গে হারিয়ে যাওয়া একটি পুজোর কথা স্মরণ করতেই হয়। সে পুজোর অভিনবত্বের কারণেই তা স্মরণীয় হয়ে আছে। ভাতৃদ্বীতিয়ার দিন কলকাতার ২২, নম্বর রাধানাথ মল্লিক লেনের বসু মল্লিক পরিবারে লোকেদের আগমন এইং পুজো দেখতে। এ যে সে পুজো নয়, সাক্ষাৎ যমরাজের ডানহাত চিত্রগুপ্তের পুজো। মাটীর তৈরী চুর্তভূজ মূর্তি।হাতে তার গদা, অসি, কলম আর কালির  দোয়াত থাকত হাতে। সামনে থাকত তার বাহন মহিষ। পুজোর পরে বির্সজন দেওয়া হতো ঘটা করে এই চিত্রগুপ্তের মূর্তি। 

এই পুজো নিয়ে গান বাঁধাও হয়েছিল। ১৩৪৪ সালে ১১, ১৩ ও ১৪ই পৌষ তারিখে রাজা রাধাকান্ত দেবের বাড়িতে মহা সন্মেলন বসেছিল ‘নিখিল ভারতবর্ষীয় কায়স্থ মহাসন্মেলন'।এই সন্মেলন উপলক্ষে অরুণ কুমার ঘোষ একটি গান রচনা করেন। সেই গানে চিত্রগুপ্তের উল্লেখ পাওয়া যায়। তার নির্বাচিত কিছু অংশ। 

“বিস্তীর্ণ ভারতভূমে 

চিত্রগুপ্ত বংশ- ধরেরা 

আছে নানান দিকে। 

কিছু ভিন্ন হলেও তবু, 

মূলে তারা সবাই এক 

সন্দেহ নাই কভু।। 

সাম্যমন্ত্রে তাদের সবে, 

করগো দীক্ষিত, 

সঙ্গবদ্ধে বলীয়ান কর এবে। 

চিত্রগুপ্তের মহাবীর্য্যে 

যে কুল শোনিতে বহে।।“

আরেকটি গানেও এই চিত্রগুপ্তের সন্ধান পাওয়া যায়। এই গানের লেখক ছিলেন মুনীন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী। গানের নির্বাচিত অংশ, 

“কার হতে যারে সৃজিল ব্রক্ষা 

কায়্স্থ হলো সে ধন্য।। 

শুধু নহে মসী,করে তার অসি 

ক্ষত্র বলিয়া গণ্য।। 

অনাদিকালের চিত্রগুপ্ত 

পুরাণ পুরুষ তার।। 

সেই জাতি  আজ ঘোষিত বিম্বে মহিমায় আপনার।।“ 

আজ এইসব ব্রত পার্বন ও পুজো সবই হারিয়ে গেছে আধুনিক কলকাতার জন জীবন থেকে।


 তথ্যসূত্র--

কলকাতার মাটী ও মানুষ / বীরেশ্বর বন্দোপাধ্যায়  

কলকাতা প্রসঙ্গে /  বীরেশ্বর বন্দোপাধ্যায় 

জনকোম্পানী বাঙ্গালী কর্মচারী / নারায়ন দত্ত  । নন্দরাম সেনের জীবনোপাখ্যান / শিবেন্দ্রনারায়ণ শাস্ত্রী      


-সি্দ্ধার্থ বসু   

আনন্দবাজার ১২এপ্রিল,২০২০, রবিবাসরীয়

Comments

Popular posts from this blog

উজ্জ্বল উদ্ধার — প্রাচীন বাংলার গান ও কবিতা

      প্রাচীন বাংলার কবিতা ও গানে সেইসময়ের সমাজ জীবনের নানান দিক ধরা পড়ে। যেখানে সেইসময়ে মেয়েদের জীবনে বিয়েকে ঘিরে যে চিত্র উঠে আাসে তা আজকের মতোই বিষাদময়। পণপ্রথার শিকার সেদিনের কণ্যাদায়গ্রস্থ পিতার। একটা অসম্পূর্ন কবিতায় এই ছবি ধরা পড়ে।          বাড়ীর পিছে ডালম  গাছে একটি ডালম ধরে।                 একটি ডালম ছিঁড়ি রাজা কণ্যাদান করে।।         কণ্যাদাণ করি রাজা ফোঁপাই ফোঁপাই কাঁদে।          বড় ভাইরে কাঁদন করে দোলার ঝলির খুন্তা ধরি।।                ছোট ভইনে কাঁদন করে খেলার ঘরে বসি।।         আমার দিদি কনে নিল খেলা ভঙ্গ করি।        বড় ভইজে কাঁদন করে পাক ঘরেতে বসি।।   কণ্যাদান প্রথার থেকে রেহাই মেলে না রাজারও। সামান্য ডালিম দিয়েও তাকে কণ্যার বিয়ে দিতে হয়। ঘৃণ্য পণ প্রথা যে প্রাচীনকালেও অব্যাহত ছিল তা ধরা পড়ে এই কবিতায়।      এই প্রস...