Skip to main content

ফোন কল

          সকাল হতে না হতে বাড়ির পিছনের বাগানে সবে লাগানো বেগুনের চারাগুলোর চারপাশের মাটীটা একটু আলগা করে দিচ্ছিল আবদুল। এই বাগান করা দিয়েই দিন শুরু হয়। ক দবছর আগেও এই সময়টা পাওয়া যেত না। সকাল হতে না হতেই গ্রামের মানুষের ঢল নামতো এই ছোট্ট বাড়িটায়। 

            নামবে নাই বা কেন বলো, তিন তিনবারের এলাকার বিধায়ক সে। কম কথা তো নয়। মানুষের বিপদে আপদে ছুটে বেড়ায় সে। গ্রামের পথে যেতে যেতে এলাকার মানুষের ডাকে সাড়া দিয়ে তার দাওয়ায় বসে পড়ে তাদের সঙ্গে সুখ দুঃখের কথা বলে। এক একদিন তো তাকে শুনতে হয়েছে, এবার নিয়ে তো তিনবার এমএল এ হলে এবার বাড়িটা দোতলা করো।  

       প্রাণী তো তিনটে। ছেলে সদরে কলেজে পড়ে। আর আমি তো বাইরে বাইরে থাকি।বয়েসও হচ্ছে। ওসব কি হবে। বলে ওঠে আবদুল মতিন। 

       লোকে কি বলে জানো, পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়ি দেকো, নিদেন মেম্বারের বাড়ি দেকো আর তোমার বাড়ির দিকে তাকালে বোঝার উপায় নাই তুমি তিনবারের এম এল এ। কদিনে যেন সবাই ফুলে ফেঁপে উঠলো। আর তুমি.. হারাণ মিত্তির বলে উঠে। গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের হেডমাষ্টার। 

      মাষ্টার, তোমার কথাটা ঠিকই। কদিনেই লোকগুলো বদলে গেল। আশ্চর্য় লাগে এক একসময়, লোভ এত বেড়ে গেল কি করে! রাজনীতিটা এখন ব্যবসার কেন্দ্র হয়েছে। জন সেবার নয়। 

       নিজেদের আখের গোছানোই একমাত্র লক্ষ্য। হারাণ মিত্তির বলে ওঠে। 

       ঠিক কথা। এসব যেন কতকালের কথা। সময় কেমন যেন বদলে গেছে। তবে এখনো মানুষের পাশে দাঁড়াতে ছুটে যেতে হয়। অতবড় ঝড়ের পর এলাকায় যখন তাদের জন্য সামান্য ত্রান নিয়ে গেছে, তখন মানুষগুলোর মুখে একটাই কথা, তুমি এয়েচো। সরকারী কেউ আসেনি এখনো। চারদিক তখন ঝড় আর তান্ডবে লড ভন্ড সব জলে ভাসছে চারদিক। তারমধ্যে অসহায় মানুষগুলো ভেঙে পড়া ঘরের নিচে আশ্রয় নিয়েছে। 

    এসবই এতকাল করে এসেছে আবদুল। মাঝে কিছুদিন সরকারী ক্ষমতায় এসেছিল তার দল। তাও মানুষের জন্যেই। ত্রাণ বিলি করে ফেরার মুখে আবদুলকে ঘিরে ফেলে ছিল ওরা। ক্ষমতা তো গেছে এখন আবার কি জনসেবা! যা করার আমরা করব। 

  আবদুলের সঙ্গীসাথী, গ্রামবাসীদের সামনেই এই হুমকি চলে। আবদুল খুব ঠান্ডা মাথায় বলে উঠে এখনো তো সরকারী সাহা্য্য এসে পৌঁওছোয়নি তাই....কথা শেষ হয় না ওদের মধ্যে একজন বলে ওঠে, এসব বন্ধ করতে হবে। বললাম তো ঝা করার আমরাই করব। 

    কিন্তু আমি তো এদের এ অবস্থায় ফেলে রেখে যেতে পারি না। আবদুল বলে ওঠে।

 সেদিন আর নেই। এখন  ঝা করার আমরাই করবো। ঝামেলা করো না। একজন রীতি মতো হুমকির সুরে বলে ওঠে।

  আর কথা বাড়ায় না আবদুল। কিন্তু এলাকার মানুষকে সেদিন ছেড়ে আসেনি সে। তার এই কাজকে ভালো চোখে নেবেনা ওরা তাতো জানা কথা। তাই নানান হুমকি ফোন আসতে থাকে। অজানা নম্বর থেকে। 

  অনেকে বলেছে অচেনা অজানা নম্বর ধরো না। 

 আবদুল হেসে বলেছে, না ধরলে হয়, গ্রামের মানুষজন যদি করে। তারা যে কিছু হলে আজও আমাকেই ডাকে, আমার কাছে আসে।

      তা তো জানি।  কিন্তু রোজ রোজ এইরকম অসভ্যতা ফোনে । 

  মানুষের কাজ করতে গেলে অমন একটু আধটু কথা শুনতে হয়। আর একটা কথা কি জানো,  এতে বোঝা যায় ওরা ভয় পেয়েছে তাই ভয় দেখায়। যাতে আমরা মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হই। 

এসব তো কত কথাই তো হয় এলাকার  মানুষজনের সঙ্গে। বাগানেরও কম ক্ষতি হয়নি ঝড়ে। আবার সব নতুন করে করতে হচ্ছে। বেড়ার ধারের গাছ গুলোয় জল দিতে গিয়ে ভেতর থেকে ডাক আসে, বলি নাস্তাপানি কি আজ করবা না? 

      হ্যাঁ হ্যাঁ যাই। এতদিন পর বাগানে হাত দিলাম তো তাতেই দেরী,যাচ্ছি। বলে সব গুছিয়ে আবদুল ঘরে যায়।  

       আজ আবার বেরুবা নাকি? খেতে দিয়ে ওর স্তী ফতিমা বলে ওঠে। 

হাত মুখে জল দিয়ে বলে ওঠে, বাগদী পাড়ার দিকটা যেতে হবে।

করোনায়,  এখনো ওদিকটায় যাওয়াই হয়নি। বাইরে থেকে হাঁক পাড়ে গোবিন্দ। পার্টীর সর্ব ক্ষণের কর্মী। ওর গলা শুনেই আবদুল বলে ওঠে, হ্যাঁ চলো আমি তৈরী। মুখে মাস্কটা ভালো করে লাগায়। তারপর বলে ওঠে, ওদের ওখানে দেওয়ার মাস্কের বাক্সোটা এনেছ তো? 

     হ্যাঁ। গোবিন্দ বলে ওঠে।

কাঁধে ঝোলাটা ঝুলিয়ে নেয় আবদুল। ঝোলায় কিছু লিফলেট আছে বিজ্ঞান মঞ্চের।তাতে কিছু নিয়ম কানুন আছে এই সময়ের জন্যে। 

গোয়াল ঘরের পাশের দেওয়ালে হেলান দেওয়া সাইকেলটা বের করে। তারপর গেট খুলে বের হতেই ঘর থেকে বউ বলে ওঠে, মোবাইলটা নাওনি তো। 

       এই দেখ ভুলে গেছি একদম। দাও। বলে মোবাইলটা নিয়ে পাজ্ঞাবীর পকেটে ফেলে। তারপর বলে চলো গোবিন্দ। দেরী হয়ে গেল। ওরা সব অপেক্ষা করবে,চলো। বলেই হসাইকেলে উঠে পড়ে।

       যেতে যেতে গোবিন্দ বলে ওঠে, সামনে ভোট। ওরা যদি আবার পঞ্চায়েত ভোটের মতো করে আর মানুষ যদি না এগোয় তাহলে কিযে হবে।

        দেখছো তো গ্রামের মানুষ কিরকম ফুঁসছে। সবাই বুঝতে পারছে তাদের সঙ্গে ধাপ্পাবাজী করেছে। সামনে দেখে দেখে চালাও।

       কোথায় চললে গো মতিন সাহেব? রাস্তার পাশ থেকে একজন চেঁচিয়ে ওঠে। 

ওকে দেখেই আবদুল সাইকেল থামিয়ে বলে ওঠে, তিনকড়ি যে, বাজার যাচ্ছো বুঝি? তা আমি আবার সাহেব হলাম কবে! 

     একটা কথা বলি তোমায় বয়স তো কম হলো না আমি তোমার পার্টীর লোকও আমি নই,তবু বলি তোমার মতো সৎ মানুষ যে কোনে পার্টীর গর্ব। 

     সেকি হে’ তোমার দলে তো.... কথা শেষ হয় না তিনকড়ি বলে ওঠে, আমার দলের কথা আর বোলো না। সবই তো জানো। কি করব বুঝতে পারি না এখন, মনে হয় তোমরাই ঠিক ছিলে। এখন আবার সৎ মানুষ খোঁজা শুরু হয়েছে। চলি, তোমার দেরী করিয়ে দিলাম। সাবধানে থেকো ভোটে বাদ্যি বেজে গেছে। যাও। গোবিন্দ দাঁড়িয়ে আছে। বলে তিনকড়ি বাজারের পথ ধরে।  ছাপোষা মানুষ, সামান্য কাজকর্ম  করে সংসার চালায়। অনেকের মতো সেও অনেক আশা নিয়ে ভোট দিয়েছিল। আজ হতাশাগ্রস্থ সে। সামনে ভোট ভয়ে হয়  আবদুলের সঙ্গে রাড্তায় কথা বলে। কে আবার লাগিয়ে দেবে নেতাদের কানে। তবে অনেকদিন পর মানুষটার সঙ্গে কথা বলে মনটা হালকা হলো। 

     এরকম নানা লোকে ভেতরে ভেতরে নিজেদের ভুল বুঝতে পারছে। বুঝলি গোবিন্দ।

বলে ওঠে আবদুল। 

      তোমার তাই মনে হয়? গোবিন্দ বলে ওঠে।  

      কেন তুই বুঝিস না। গ্রামে গ্রামে তো ঘুরছিস। তাদের কথা তো শুনছিস। অভিযোগ আর অভিযোগ। কিন্তু কিছু করতে পারছে না, অসহায়। এদের পাশেই আমাদের দাঁড়াতে হবে। আবদুল বলে ওঠে। দুপাশে গ্রামের মানুষ তাকিয়ে দেখছে আবদুলকে। এই বয়েসে পারে বটে মানুযটা। 

     চল্লে কোথায় হে? চলমান আবদুলকে লক্ষ্য করে এক গ্রামবাসী চেঁচিয়ে ওঠে।

     একবার বাগদী পাড়া যেতে হবে। তা আছো কেমন তোমরা?  আবদুল বলে ওঠে।

     আর আছি কেমন! চলে যাচ্ছে। তোমরা নাই আর.. 

      নেই কি হে, দরকারে সব সময় তোমাদের পাশেই আছি। সাইকেল থামায় আবদুল।

      আবার থামল কেন? গোবিন্দ বলে ওঠে। 

     দাঁড়া, দাঁড়া। ফোনটা তখন থেকে ব্যাগের মধ্যে বাজচ্ছে। বলে ব্যাগে হাত ঢোকায়। তারপর ফোনটা হাতে নেয়। 

     ওদের ওখান থেকে করছে বুঝি?  গোবিন্দ বলে ওঠে। 

     না।

     তবে কে আাবার। 

     জানি না। নম্বরটা.... 

     অজানা হলে ধরে কাজ নেই এখন, চলো। গোবিন্দ বলে ওঠে।

     দাঁড়া, কে ফোন করছে একবার দেখে নিই। বলেই ফোনটা ধরে। 

অচেনা গলায় একজন বলে ওঠে, আপনার সঙ্গে কথা আছে। 

      বলুন। বলছি। কে বলছেন আপনি? 

      আমরা একটা কাজ করছি, তাই আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই। 

      কি কাজ? আবদুল জিজ্ঞেস করে। 

      সামনে নির্বাচন তাই।

      তাই কি?  

     আপনি তো জানেন আপনাদের মতো সৎ মানুষ এখন আর রাজনীতিতে আসে না।                   আপনাদের মতো মানুয যদিও এখনো যে কোন দলের সম্পদ। 

এবার খুব কঠিন আর ঠান্ডা গলায় আবদুল বলে উঠে, আসল কথা এখনো আপনি বলেন নি। আর আমি সৎ এ কথা আপনাকে কে বলল। 

       আমাদের টীম সব খোঁজ নিয়েই আপনার কাছে প্রস্তাব রাখছে কি, আপনাকে তো আপনার দল মন্ত্রী করল না। আমরা আপনাকে....  

       আমার দল ছাড়লে মন্ত্রীত্ব পাবো। তাই তো। 

       হ্যাঁ,হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। ওপার থেকে বেশ উল্লসিত গলার স্বর।

         নিজের 

দলের সঙ্গে বেইমানী করে মন্ত্রীত্বের লোভে চলে গেলে, আমি কি করে সৎ থাকবো বুঝলাম না। আপনারা তো সৎ মানুষ খুঁজতে বেড়িয়েছেন তাই না? 

ওপার থেকে  কোন শব্দ হয় না। 

আবদুল বলে, বড় ভুল জায়গায় ছিপ ফেলেছেন। আমাদের কাছে আদর্শটা বড়। বলেই ফোনের লাইনটা কেটে দেয়।  

       কার ফোন? গোবিন্দ বলে ওঠে।

       মানুষ কেনার কম্পানির। 

এ কথায় গোবিন্দ অবাক হয়ে তাকায় আবদুলের দিকে।

 

-সিদ্ধার্থ বসু  

একুশ শতক  /  ডিসেম্বর ২০২০


Comments

Popular posts from this blog

উজ্জ্বল উদ্ধার — প্রাচীন বাংলার গান ও কবিতা

      প্রাচীন বাংলার কবিতা ও গানে সেইসময়ের সমাজ জীবনের নানান দিক ধরা পড়ে। যেখানে সেইসময়ে মেয়েদের জীবনে বিয়েকে ঘিরে যে চিত্র উঠে আাসে তা আজকের মতোই বিষাদময়। পণপ্রথার শিকার সেদিনের কণ্যাদায়গ্রস্থ পিতার। একটা অসম্পূর্ন কবিতায় এই ছবি ধরা পড়ে।          বাড়ীর পিছে ডালম  গাছে একটি ডালম ধরে।                 একটি ডালম ছিঁড়ি রাজা কণ্যাদান করে।।         কণ্যাদাণ করি রাজা ফোঁপাই ফোঁপাই কাঁদে।          বড় ভাইরে কাঁদন করে দোলার ঝলির খুন্তা ধরি।।                ছোট ভইনে কাঁদন করে খেলার ঘরে বসি।।         আমার দিদি কনে নিল খেলা ভঙ্গ করি।        বড় ভইজে কাঁদন করে পাক ঘরেতে বসি।।   কণ্যাদান প্রথার থেকে রেহাই মেলে না রাজারও। সামান্য ডালিম দিয়েও তাকে কণ্যার বিয়ে দিতে হয়। ঘৃণ্য পণ প্রথা যে প্রাচীনকালেও অব্যাহত ছিল তা ধরা পড়ে এই কবিতায়।      এই প্রস...