রানাঘাট পালচৌধুরী জমিদার বাড়ির জমিদারী তখন একেবারেই পড়ে গেছে। থাকার মধ্যে ভগ্নপ্রায় বিশাল বাড়ি, ঠাকুরদালান,নাটমঞ্চ, বাড়ির সামনের গেটের দুপাশে দুটি কামান। তারপর বাগান পেরিয়ে মহল। এখনও কামান দুটো বাড়ির অভিজাত্য জানান দিচ্ছে। নহবত খানার দু দু দুটোর মধ্যে একটা এখনও সারা গায়ে বটের শেকড় আর জটার বেড়াজাল মাথায় নিয়ে পুরোন দিনের আভিজাত্যের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে।
আমি ষখনকার কথা বলছি তখনও পালচৌধুরী বাড়ির অলিন্দে ক্ষীরোদ পালচৌধুরী মশাইকে দেখা যেত। একএকে সব কলিয়ারী চলে গেছে।
জমিদারী বলে আর কিছুই নেই, তবুও ইয়ার দোস্তের আনাগোনা অল্পবিস্তর আছে। একটা ঘরে কাচের বাক্সে জমিদার বংশের শিকার করা মড়া বাঘ। তার পেছনের দেওয়ালে বন্দুক হাতে বাঘ শিকারী জমিদারবাবুর ছবি। পায়ের কাছে গুলি খাওয়া মৃত বাঘ।
ঘরের কোণার দিকে পিয়ানো এ্যাকাডিয়ান রাখা। ছোটদের কাছে এগুলোর আকর্ষণ ছিল খুব। তারপর পুরোন বাড়ির বিশাল খিলানের নীচে অযত্নে পড়ে থাকত একটা পালকি। অনেকে বলত পালচৌধুরী বাড়ির মেয়েদের এই পালকি চেপে সুরঙ্গ পথ দিয়ে নিয়ে গিয়ে পালকি শুদ্ধু ডুবিয়ে স্নান করিয়ে আনা হত। কারণ তাদের মুখ যাতে বাইরর কেউ দেখতে না পায়। এসব ষখনকার কথা তখন রানাঘাটের রাস্তায় বিজলী বাতি জ্বলেনি। তারপর আস্তে আস্তে সব কিছুরই পরিবর্তন হয়ে যেতে লাগল সময়ের নিয়মে।
ঐ পালচৌধুরী বাড়ির মেয়ে মৈত্রেয়ীদি ছিলেন দিদির বন্ধু। সেইসূত্রেই ঐ বাড়িতে দিদির যাতায়াত ছিল। ওখানে গেলেই দিদির কাছে অনুরোধ আসত গান শোনানোর। গানের গুণমুগ্ধ শ্রোতা ছিলেন ক্ষীরোদ পালচৌধুরী মহাশয়। দিদি ( চিত্রা বসু ) সঙ্গীতশাস্ত্রী শিবকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সুযোগ্য ছাত্রী ছিল।
দিদির সূত্রেই আমার পালচৌধুরী বাড়িতে যাওয়া।
আর এই সূত্রেই আমার দেখা পালচৌধুরী বাড়ির শেষ লেঠেল বা পাহারাদারকে।
তখন অবশ্য সে বাড়ির অন্য কাজও করত। দিদিকে পালচৌধুরী বাড়ি থেকে আমাদের বাড়ির দরজা অবধি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল তার। তাকে দেখতে ছিল একচালা আদি দুর্গা প্রতিমার অসুরের মত। একমাথা কাল কোঁকড়া কোঁকড়া চুল।
তেমনি একটা ইয়া পাকানো গোঁফ। তার দুটো দিক উপরের দিকে পাকিয়ে তোলা। চোখ দুটোও ছিল সেরকম। আর শরীর ছিল পেটা পাকানো।
তার ডান হাতে থাকত তেল চুকচুকে পাকা বাঁশের লাঠি। আর বাঁ হাতে ধরা থাকত একটা লন্ঠন। আমাদের বাড়ির সামনের মাঠে এসে দাঁড়াত, আর যতক্ষণ দিদি বাড়িতে দরজা দিয়ে না ভেতরে ঢুকে যেত সে কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকত।
তারপর দিদি ঘরে ঢুকলে সে চলে যেত। মুখে কোন কথা খুব একটা বলত না। এতক্ষণ তার নামটাই বলা হয়নি। তাঁর নাম ছিল ক্ষুদিরাম।
-সিদ্ধার্থ বসু
Comments
Post a Comment