বাংলা নাট্য জগতে যে কজন শক্তিমান নাট্যকারকে আমরা পাই তার মধ্যে অন্যতম কবি দিজেন্দ্রলাল রায়। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বলা যায় প্রথম বারো বছরে বাংলা নাট্য জগতে যে্ ক জন শক্তিমান নাট্যকারকে আমরা পাই তাদের মধ্যে দুজনই ছিলেন মূলত কবি।প্রথম জন ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ ও দ্বিতীয় জন দিজেন্দ্রলাল রায় যিনি ডি এল রায় নামে সমধিক পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর বাংলা নাট্য জগতে আত্মপ্রকাশ ঘটে প্রহসন নাটক দিয়ে। ১৮৯৫ সালে ‘কল্কি অবতার’ তাঁর প্রথম প্রহসন নাটক ।
কর্ম জীবনে তিনি ছিলেন সরকারের শাসন বিভাগের উচ্চ পদে।
তিনি ইংলন্ডে পাড়ি দেন কৃষি সংক্রান্ত বিষয়ে শিক্ষা গ্রহনের উদ্দেশ্যে।
যদিও তার খ্যাতিলাভ হয় কবি সাহিত্যিক ও নাট্যকার হিসেবে। ‘কল্কিঅবতার’ প্রহসনটি মজার ছড়া ও হাসির গানের মালা দিয়ে রচিত।
নাট্যকার হিসেবে দিজেন্দ্রলাল নাট্যকার অমৃতলাল বসুর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। এ অভিমত সুকুমার সেন মহাশয়ের।
প্রহসনের পরে তিনি যথাক্রমে রামায়ণ ও মহাভারত নিয়ে দুটো নাটক রচনা করেন।
রামায়ণ এর কাহিনী অবলম্বনে রচনা করেন “সীতা”। এই নাটকটি মুক্ত পয়ার ছন্দে লেখা। ‘সীতা’ নাটকটি ১৯০২ সালে লেখা, এই নাটকটা তাঁর লেখা নাটকগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ নাটক। এই নাটক নিয়ে একসময়ের বাংলা রঙ্গমঞ্চের দিকপাল অভিনেতাকে হতাশ হতে হয়। সে সময়ে ইডেন গার্ডেন্সে একটা একজিবিশন হয়। সেখানেই শিশিরকুমার ভাদুড়ী মশাই একটা দল করে দ্বিজেন্দ্রলালের ‘সীতা’ নাটকটি অভিনয় করে দর্শকদের মুগ্ধ করে দেন। যদিও পরবর্তীকালে তিনি যখন মনোমোহন থিয়েটার লীজ নিয়ে ‘মনোমোহন নাট্যমন্দির’ স্থাপন করেন। এই নাট্যমন্দির উদ্বোধন দিজেন্দ্রলালের ‘সীতা’ নাটক অভিনয় মাধ্যমেই করবেন এটাই তাঁর মনবাসনা ছিল। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি কারণ তাঁর প্রতিদ্বন্দী আর্ট থিয়েটার আগেই দিজেন্দ্রলালের ‘সীতা’ নাটকের অভিনয় সত্ত্ব কিনে নিয়েছিল। এতে মনক্ষুন্ন না্ট্যাচার্য শিশিরকুমার নাট্যকার যোগেশ চৌধুরীকে দিয়ে নতুন করে ‘সীতা’ নাটকটা লিখিয়ে মনোমোহন থিয়েটার উদ্বোধন করেন। যদিও এটা বাংলা নাট্যশালার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য যে আর্ট থিয়েটার আর মনোমোহন নাট্যমন্দির বাংলা থিয়েটারের মড়া গাঙ্গে-জোয়ার এনেছিল।
তিনি ১৯০৩ সালে রাজপুত ইতিহাস নিয়ে ‘তারাবাঈ’ লেখেন। ‘সোরাব রুস্তম’ ও ‘তারাবাঈ’ দুটো নাটকই অতিনাটকীয়তার দোষে দুষ্ট। ‘সোরাব রুস্তম’ নাটকটিতে গানের আধিক্য বেশী। এই নাটকটি মুক্ত পয়ার ছন্দে লেখা, রবীন্দ্র প্রভাব যুক্ত। ‘তারাবাঈ’ নাটকটি দর্শক হৃদয় ছুঁতে পারেনি।
তাই তাঁর এই নাটক জনপ্রিয় হয়নি।
এরপর ১৯০৭ সালে লেখা আরেকটি নাটক ‘পাষাণী’ বাংলার নাট্যমোদীদের উপহার দেন। এই নাটকের বিষয়বস্তু ইন্দ্র কর্তৃক অহল্যাকে অপহরণ। এই নাটকের চরিত্রায়ণে গিরিশচন্দের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
পরবর্তী সময়ে দিজেন্দ্রলাল যে সমস্ত নাটক রচনা করেন সেগুলো গদ্যে।
তাঁর গদ্য ছিল বলিষ্ট। বলা যায় এক্ষেত্রে দিজেন্দ্রলাল রবীন্দ্র প্রভাব মুক্ত হয়েছিলেন। ডি এল রায় মনে করতেন রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাকে মেয়েলি করে দিয়েছেন। সেই সময়ে অনেকেই এই একই ধারণা পোষণ করতেন।
যদিও সেটা আলাদা বিষয়। ডি এল রায়ের ‘সাজাহান’ নাটককে চরিত্র চিত্রায়নে মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছিলেন। সাজাহানের মনের অন্তর্দ্বন্তের
প্রকাশ ঘটে তাতে ধরা পড়ে তাঁর হৃদয়ের বেদনা, অসহায় পিতার কাতর আকুতি ও ক্ষোভের ছবি।
স্নেহময় পিতার পাশাপাশি আঔরঙ্গজেবের নিষ্ঠুর আচরণ দর্শক হৃদয় চরম বিষাদগ্রস্থ করে তোলে।
এই নাটকে দুটো গান ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না’কো তুমি’ ও ‘সধবা অথবা বিধবা তোমার বহিবে উচ্চ শির' নাট্যমোদি দর্শকদের উদ্বেলিত করে তুলত। তাদের চিত্তে উদ্দীপনার সৃষ্টি করত। এটা যারা এই নাটক দেখেছেন তারা অবশ্যই স্বীকার করবেন।
অন্য নাটক ‘মেবার পতন’। এই নাটকের মূল উপাদান রাজপুত ইতিহাস থেকে নেওয়া।
ইতিহাস আশ্রিত এই নাটকে মানসী চরিত্রটি তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি। তার মধ্যে হতাশা,নৈরাশ্য নেই আছে পজেটিভ চিন্তা ও কল্পনার সংমিশ্রণে প্রেরণার ঈঙ্গিত। পাশাপাশি এই নাটকে আরেকটি চরিত্রও দর্শকদের নজর কাড়ে। সেটা কল্যণী, যে মানসীর মত বুদ্ধিদীপ্ত না হলেও হৃদয়গ্রাহী। এই নাটকে হিন্দু মুসলমানের বিরোধের মুখে নতুন দিক নির্দেশ করে।
স্বামী মুসলমান ধর্ম গ্রহন করা সত্বেও কল্যাণী স্বামীকে পরিত্যাগ করে না। স্বামী স্ত্রীর চিরকালীন সম্পর্ককে সে আদর্শ হিসেবে মান্যতা দেয়।
এই বলিষ্ঠতা নাট্য চরিত্রের মধ্যে দিয়ে নাট্যকার সমাজের সামনে হাজির করেন। হতাশা মুক্ত,নিরাশক্ত,নিস্পৃহ মানসী সহচরীকে দিয়ে গাওয়ায় সেই গান ‘গিয়াছে দেশ দূঃখ কি, আবার তোরা মানুষ হ'। বাংলা মানুষকে প্রেরণা যোগায়।
দিজেন্দ্রলাল তাঁর কোরাস গানে ও বাংলা গদ্যে বিদেশী সুর ও ছন্দের বারবার ব্যবহার করেছেন। তবে এই বিদেশী সুর ও ছন্দকে তিনি বাংলা ভাষায় মিশিয়ে দিয়ে বলা যায় রীতিমত বাঙালী করে তুলে ছিলেন দক্ষতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মতই।
নাটকের গানে তিনি শা্স্ত্রীয় সঙ্গীতের নানা রাগরাগিনী ব্যবহার করেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। এই গানগুলোর অনেকগুলোই সচেতন করে তুলতো নাট্যমোদি দর্শককুলকে। এ প্রসঙ্গে জানাই, ‘চন্দ্রগুপ্ত’ নাটকে ‘ভারতবর্ষের রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি ব্যবহার তা ছিল, ‘সুনীল জলধি হইতে উঠিলে জননী ভারতবর্ষ অধিকতর সুন্দর এবং সার্থক।‘
এখানে বলা প্রয়োজন ভারতবর্ষ জননী নয় জনক। কিন্তু এতে নাটকত্ব কিছু মাত্র ক্ষুণ্য হয়েছে তা নয়। অবশ্য এ বিষয়ে ভিন্ন মতও আছে।
ন্যাটাচার্য শিশিরকুমার এই নাটক পরিচালনা করতে গিয়ে স্বাধীনতা নিয়েছেন। তিনি চাণক্যের দৃশ্য দিয়ে চন্দ্রগুপ্ত নাটক শুরু করতেন। যদিও অনেকে মনে করেন প্রথম দৃশ্যটি আবশ্যিক ছিল মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্টার সম্ভাবনা বোঝানোর জন্য।
নাট্যকার নিশিকান্ত বসুর তিনটি নাটক ‘দেবলা দেবী’ ‘বঙ্গে বর্গী’ ‘পথের শেষে’ বাংলাদেশের শহরে ও গ্রামে সর্বত্র অভিনীত হয়েছে। তাঁর নাটকে দিজেন্দ্রলালের গদ্যরীতি ও নাটকীয়তা অত্যধিক অনুকরণ ছিল।
১৯০৫ থেকে ১৯১২ সাল অবধি লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ নিয়ে দেশ যখন উত্তাল, সেই সময়ে গিরিশ ঘোষ, অমৃতলাল বসু, মনোমোহন রায়, অতুল মিত্র, হরনাথ বসু, মণিলাল বন্দোপাধ্যায়, ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ নাটকের পাশাপাশি দিজেন্দ্রলালের ‘বহুৎ আচ্ছা” “রাণাপ্রতাপ” “দুর্গাদাস” “নুরজাহান” “সোরাব – রোস্তম” “মেবারপতন” ‘সাহাজান” নাটকগুলো জনপ্রিয় হয়।
দিজেন্দ্রলাল রায় বা ডি এল রায়ের নাটকগুলোর জনপ্রিয় শুধুমাত্র জনচিত্তে দেশাত্মবোধ জাগিয়ে নয়, তাঁর জনপ্রিয়তার মূলে ছিল বলিষ্ঠ গদ্য ও পদ্যের ছন্দের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য, প্রাণবন্ত চরি্ত্রগুলোর উপস্থাপনা ও গানের উজ্জ্বল উপস্থিতি।
তথ্যসূত্র —
সাহিত্য সেবক সমিতি সুবর্ণ জয়ন্তী স্মারক গ্রন্থ ১৯৬৪
যুগ্ম সম্পাদক গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য / সোমেন্দ্রচন্দ্র নন্দী
বাংলার সাহিত্য-ইতিহাস সুকুমার সেন / সাহিত্য অকাদেমি ১৯৬৫
–সিদ্ধার্থ বসু
Comments
Post a Comment